উন্নত সমাজের মাপকাঠি

সুইডিশ কেমিক্যাল সোসাইটি থেকে পোস্টডকের জন্য স্কলারশিপ দেয়া হবে। বৃত্তির সংখ্যা তিনটি। অর্থমূল্য সাড়ে তিন লক্ষ সুইডিশ ক্রোনর। যেনো-তেনো কথা নয়! আমি সুইডিশ নই। আমার নামের আগে মোহাম্মদ। মুখের ভাষা বাংলা। দুই অক্ষর সুইডিশ জ্ঞান নেই। দেখতেও সুইডিশদের মতো নই। বৃত্তিতে কোন কোটা নেই। অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের গবেষণা প্রমোট করার জন্যও নয় এই স্কলারশিপ। না ধর্মে, না সংস্কৃতিতে তাদের সাথে আছে আমার মিল। তবুও আমি আবেদন করলাম।

বৃত্তিপ্রাপ্তদের চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু অপেক্ষা সইতে পারলাম না। সময় মতো ফোন করলাম। জানলাম, তালিকার প্রথমে রাখা হয়েছে আমার আবেদন। সে বৃত্তি পেলাম গতবছর। সুইডিশ কেমিক্যাল সোসাইটির পেইজে সে খবর ঝুলিয়ে দেয়া হলো। আমার নাম-ধাম, বাড়ী, ধর্ম, চেহারা, রাজনৈতিক পরিচয়, খাবার অভ্যাস, ভাষা এগুলো ওদের দেখার বিষয় না। ওরা দেখেও না। এসব সমাজ উন্নত হয়েছে এ কারণেই। যা দেখার শুধু তাই দেখে। আর তা হলো যোগ্যতা।

যে দেশটির সাথে আমার বস্তুত কোন দিক দিয়েই সম্পর্ক নেই, তারা আমাকে বৃত্তি দিলো যা দেখে তা হলো আমার কাজ। কার অধীন পিএইচডি করেছি। সে প্রফেসরের রেপুটেশন কেমন। যে ইউনিভার্সিটিতে কাজ করেছি সেটির মান কেমন। গবেষণায় কতো ভালো পাবলিকেশন ছিলো। যে ইউনিভার্সিটিতে পোস্টডক করতে চাই সেটার র‍্যাংকিং কেমন। যে প্রফেসরের অধীন পোস্টডক করবো তার খ্যাতি কেমন এবং সর্বোপরি গবেষণার একটি প্রপোজাল দিতে হয়েছে, সেটার মান। মাসাধিক কাল ব্যায় করে সে প্রপোজাল লিখেছিলাম।

যে দেশটিতে জন্মেছি, সে দেশটিতে যদি একটি আবেদন করি তাহলে কী হবে? —আমার বাড়ী কই, বাবা কী করতেন, রাজনৈতিক পরিচয় কী, সরকারী দলে লোক আছে কিনা, কোটা আছে কিনা, সরকারের তোষামোদী করতে পারবো কিনা, মন্ত্রণালয়ে পরিচিত কেউ আছে কিনা ইত্যাদি হেনকর যতো বিষয় আছে সেগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দেখা হবে। ব-বিদ্যা নিয়ে চেয়ার দখল করে বসে থাকা মানুষদের দয়া-দাক্ষিণ্যের জন্য হা করে বসে থাকতে হবে। মুখ দিয়ে মশা গমনা-গমন করলেও বিরক্ত হওয়া যাবে না।

ইউরোপ-আমেরিকায় আমি কতগুলো মেধাবী বাঙালীকে চিনি। কথা বললেই তাদের বেদনার কথাগুলো উঠে আসে। আর সে বেদনার নাম হলো প্রবঞ্চনা। যোগ্য হওয়ার পরও বঞ্চিত হওয়ার দুঃখ তাদের কাঁদায়। উন্নত সমাজ এইসব প্রবঞ্চিত ছেলে-মেয়েদের আলিঙ্গন করে। সারা দুনিয়ার ধনী দেশগুলোতে, বাংলাদেশের ছেলে-মেয়েরা বিকশিত হতে পারে। অথচ নিজ দেশে পারে না।

মাপকাঠি যেখানে নড়বড়ে, সেখানে শৃঙ্খলা হলো দুরাশা। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা সেখানে স্বপ্ন মাত্র। যোগ্যতার সঠিক যাচাই না হলে সমাজ গোড়া থেকে পঁচতে শুরু করে। দেশটাকে যদি দাঁড় করাতে হয় তাহলে মাপকাঠির মাপে ছাড় দেয়া যায় না। আমরা কী সেটা আজও বুঝতে পারছি?
………………..
ফিলাডেলফিয়া

রউফুল আলম

ফেচবুক থেকে নেওয়া

 

Comments

comments