কাউকে পছন্দ না হলে তাকে উগ্র বলা অনেকের স্বভাব

তাসলিমা নাসরিন

আমি যখন থেকে নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলতে শুরু করলাম, তখন থেকেই নারীবিরোধী লোকেরা আমাকে উগ্র নারীবাদী বলতে শুরু করলো। নারীবাদ যে মানে না, নারীবাদ ব্যাপারটাকে সে উগ্র বলে মনে করে। মেয়েরা নিজের পছন্দ মতো চললে উগ্র বলে গালি দেয় লোকেরা। সেই লোকেরা গালি দেয়, যারা মেয়েদের পরাধীন দেখতে পছন্দ করে।

জঙ্গিবাদ আর উগ্র জঙ্গিবাদ। ১০ জন মানুষ মারা যদি জঙ্গিবাদ হয়, ১০০জন মানুষ মারা তবে কি উগ্র জঙ্গিবাদ? জঙ্গিবাদ ব্যপারটাই মন্দ। জঙ্গিবাদের আগে উগ্র শব্দটি বসালে মনে হতে পারে উগ্র জঙ্গিবাদটা খারাপ কিন্তু জঙ্গিবাদটা অতটা খারাপ নয়। দুটোই একই রকম খারাপ। যে জঙ্গি ১০ জনকে মারতে পারে, সে সুযোগ পেলে ১০০ জনকেও মারতে পারে।

নাস্তিকদের কেউ কেউ বলে উগ্র নাস্তিক। নাস্তিকেরা নিজের মত প্রকাশ করলে তারা উগ্র। নাস্তিকদের কারণে নাকি জঙ্গি জন্ম নিচ্ছে। নাস্তিকদের যুক্তিতর্ক পড়ে মানুষ নাস্তিক হয়, জঙ্গি হয় না। জঙ্গি হওয়ার কারণ কী, তা জঙ্গিদের কাছে জিজ্ঞেস করলেই পাওয়া যায়। আজ পর্যন্ত কোনও ধর্মীয় সন্ত্রাসী বলেনি, নাস্তিকদের লেখা পড়ে সে সন্ত্রাসী হয়েছে। দেশ বিদেশের সব সন্ত্রাসীই বলেছে, ধর্মের বই পুস্তক পড়ে সন্ত্রাসী হয়েছে, ধর্মের ভাষণ শুনে সন্ত্রাসী হয়েছে।

নাস্তিকেরা নাস্তিকতার নামে মানুষ মারেনি। ধর্মের নামে মানুষ মানুষকে সেই আদিকাল থেকে মেরে আসছে। অনেকে বলে হিটলার নাস্তিক ছিল, হিটলার মানুষ মেরেছে। প্রথম কথা, হিটলার নাস্তিক ছিল না, হিটলার ক্রিশ্চান ধর্মে বিশ্বাসী ছিল, লিখেও গেছে সে তার নিজের বিশ্বাসের কথা। হিটলারের মানুষ মারার পেছনে হিটলারের বর্ণবাদ আর জাত বিদ্বেষ ছিল। স্টালিন নাস্তিক ছিল, স্টালিন মানুষ মেরেছে, কিন্তু নাস্তিক্যাবাদের বিশ্বাস থেকে মারেনি, মেরেছে তার কমিউনিজমের বিশ্বাস থেকে। মাও সেতং মানুষ মেরেছে, পল পট মেরেছে, মেরেছে তাদের রাজনৈতিক আদর্শের জন্য, নাস্তিকতার জন্য নয়। ধর্মের কারণে মানুষ আদিকাল থেকে বলি হচ্ছে, এখনও হচ্ছে। আমরা কেন সমস্যার সমাধান পাই না? পাই না, কারণ আমাদের নেতারা সমস্যা কোথায় তা ধরতে পারে না বলে, অথবা ধরতে চায় না বলে।

ফেচবুক থেকে

Comments

comments