মানবসৃষ্ট পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় স্থান ‘এরিয়া ৫১’

পৃথিবীতে যদি মানুষের সৃষ্টি কোন দুর্লভ যায়গা থেকে থাকে তবে “এরিয়া ৫১” তার মদ্ধে অন্যতম।  এ এলাকায় সাধারণ মানুষের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। দুর্ভেদ্য বেষ্টনীতে ঘেরা এ ঘাটির প্রবেশপথে লেখা আছে ‘সংরক্ষিত এলাকার দিকে প্রবেশের চেষ্টা করলেই তাকে গুলি করা হবে’।

তাই এই জায়গাটি নিয়েই বিশ্ববাসীর সবচেয়ে বেশি কৌতূহল। কি আছে এর ভেতর? কিইবা এমন কার্য সম্পাদন করা হয় এই ঘাটিতে, যার দরুন সেখানকার তালিকাভুক্ত কর্মীদের ছাড়া আর কাউকেই ঢুকতে দেয়া হয় না । এমন প্রশ্ন বিশ্ববাসীর মনে ঘুরপাক খাবে এটাই যেন স্বাভাবিক ।

আর ‘এরিয়া ৫১’ এমন এক সামরিক ঘাটি, যেখানকার কর্মীরা সরাসরি প্রেসিডেন্টের কাছে দায়বদ্ধ। এরিয়া ৫১ এর ভেতর আজপর্যন্ত বেসামরিক কেউ ঢুকতে পারেননি। যদি কেউ ঢুকেও থাকেন তাহলে তিনি ফিরে এসেছেন লাশ হয়ে ।

“এরিয়া ৫১” ইউএসএ গভ এতোটায় গোপন করে রেখেছে যে, যখন আমেরিকা ও সোভিয়েত উইনিয়নের মধ্যকার “স্নায়ুযুদ্ধ” হয়েছিলো তখনও এটির সম্পর্কে সোভিয়েত উইনিয়নের অভিযোগ করার পরেও তার অস্তিত্ব সিকার করে নি।

অবশেষে ১৮ই আগষ্ট ২০১৩ সালে  প্রথমবারের মত আমেরিকার সরকার স্বীকার করে নেয় যে, হ্যাঁ এই এরিয়া ৫১ এর অস্তিত্ব আছে। তাঁরা স্বীকার করে যে “যুক্তরাষ্ট্র সরকার দেশটির এক গোপন সামরিক পরীক্ষার স্থান হিসেবে ‘এরিয়া ৫১’ নামক জায়গাটি ব্যবহার করে। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) নথি থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

কি আছে ওখানে আর কেনই বা কোন সাধারণ মানুষ ওখানে প্রবেশ করতে পারে না-

 

এরিয়া ৫১ এর কর্মকতারা জানান, এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো পরীক্ষামূলক উড়োজাহাজ তৈরি, অস্ত্রশস্ত্রের সিস্টেমের পরীক্ষাকরণ এবং উন্নতিসাধন সমর্থন করা। এটি মূলত একটি সামরিক ঘাটি যেটি খোদ ইউএসএ গভ নিয়ন্ত্রণ করে। এটি পশ্চিমা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডা অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলে এবং লাস ভেগাস থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিম রেকেল গ্রামের কাছে অবস্থিত। মূল ঘাটির আয়তন প্রায় ২৬,০০০ বর্গকিলোমিটার। ইউএসএ গভারমেন্টের যত ধরনের গোপন সামরিক পরিক্ষা আছে তার সব এখানে করা হয়।

কিন্তু এই স্থানটির আশেপাশের বাসিন্দারা জানান ভিন্ন কথা।  তাদের দাবী এরিয়া ৫১ এর আকাশে ফ্লাইং সসারের মতো কিছু উড়তে দেখেছেন তারা। আবার অনেকেই এমন দ্রুতগতির বিমান উড়তে দেখেছেন যার গতি ও আকৃতি সাধারণ বিমান কিংবা যুদ্ধবিমান কোনোটার সাথেই যেন মিলে নেই।

এতো বিতর্কে ছাইয়ের মধ্যে যেন বাতাস ছড়িয়ে দিলেন এরিয়া ৫১ এর কর্মরত পদার্থবিজ্ঞানী বব লেজার ।

টিভি সাক্ষাৎকারে বব জানান, ‘সেখানে রেটিকুলাম-৪ নামক জ্যোতিষ্ক থেকে আসা এলিয়েন ও এক ফ্লাইং সসার রয়েছে। এলিয়েন বা ওই ভিনগ্রহের প্রাণীটির উচ্চতা সাড়ে তিনফুট । যার রোমহীন শরীর এবং বড় বড় কালো চোখ রয়েছে । এলিয়েনটির দেহ ব্যবচ্ছেদ করার পর এর ভেতরে ফুসফুস ও হৃৎপিন্ডের বদলে পাওয়া গেছে বিশাল এক পতঙ্গ।’ এছাড়া বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে এখান থেকে ভিনগ্রহের প্রাণীদের সঙ্গে যোগাযোগও করা হয়েছে বলে দাবি করেন অনেক কর্মকর্তা।

তবে এতসব বিতর্কই শেষ নয়। এরিয়া ৫১ নিয়ে চলমান বিতর্কের সব চেয়ে বড়টি হল মানুষের চাঁদে যাওয়া নিয়ে নাটক। আপনারা হয়ত বলবেন, মানুষ চাঁদে গিয়েছে এ নিয়ে নাটকের কি আছে? কিন্তু দুনিয়াতে প্রচুর সন্দেহবাদী আছেন যাদের ধারনা মানুষ কখন চাঁদে যায়নি। পুরো নাটকটি সাজানো হয়েছে এই এরিয়া ৫১ এর ভেতরে। মানুষ প্রথম চাঁদে গিয়েছিল ১৯৬৯ সালে, এর পর আজ পর্যন্ত একবারও কেন মানুষ চাঁদে যায় না? মজার ব্যাপার হচ্ছে এত বিতর্ক চললেও আমেরিকান সরকার এসব কোনোকিছুই স্বীকার করেনি আজ পর্যন্ত। আর তাতে করে সন্দেহ কমার বদলে আরো বেড়েছে।

পত্র-পত্রিকায় নানা সময়ে রহস্যময় এ জায়গাটিকে কেন্দ্র করে নানা খবর বের হলেও সেগুলোকে বরাবরই এড়িয়ে গেছেন আমেরিকান সরকার ।

 

এই স্থান সর্ম্পকে মানুষ তেমন কোন খবর জানে না। এ ছাড়াও এরিয়া ৫১ এর ভিতরে যে সব স্থাপনা আছে তারও তেমন ভাল কোন ছবি পাওয়া যেত না, যে সব ছবি পাওয়া গেছে সেগুলো সব স্যাটেলাইট থেকে তোলা।

এই স্থানটি নেলস মিলিটারি অপারেশন এরিয়ার অর্ন্তগত। এরিয়া ৫১ এর চারদিকের আকাশ সীমা অন্য সবার জন্য নিষিদ্ধ, এই আকাশসীমা (R-4808N) হিসাবে পরিচিত। পাইলটরা এই এলাকার আকাশকে বলে “দি বক্স” অথবা “দি কনটেইনার”।

মার্কিন সরকারের অবাধ তথ্য অধিকারের সুযোগ নিয়ে ১৯৬০ সালে মার্কিন গোয়েন্দা উপগ্রহ “করোনা” র সাহায্যে এরিয়া ৫১ এর ছবি তোলে এই ছবিতে ৫১ এর ভিতরকার সবকিছু প্রকাশ হয়ে পড়ে। সাথে সাথে মার্কিন সরকার সেই ছবি মুছে ফেলে।

পরবর্তীতে “নাসার” ল্যান্ডস্যাট ৭ উপগ্রহের সাহায্যে ৫১ এর ছবি তোলা হয়, বর্তমানে এই ছবিটিই সরকারি ভাবে প্রকাশিত এরিয়া ৫১ এর ছবি।

কিন্তু এত কিছু চেস্টা করেও শেষ রক্ষা হয়নি। রাশিয়ার গোয়েন্দা উপগ্রহ “ইকনস” ও রাশিয়ার বেসামরিক উপগ্রহ আমেরিকা রাশিয়ার ঠান্ডা যুদ্ধের সময় এই এরিয়া ৫১ এর ভিতরে কি হচ্ছে তা জানার জন্য (রাশিয়ার নিজেদের প্রয়োজনে) এর উচ্চ রেজল্যুশনের ছবি তোলে। এই ছবিতে ৫১ এর ভিতরকার প্রায় সবকিছু প্রকাশ হয়ে পড়ে। বর্তমানে এরিয়া ৫১ এর ভিতরকার ছবি আর গোপন নেই নেটে এর প্রায় সব ছবি পাওয়া যায়।

এই ছবিতে দেখা যায় যে এরিয়া ৫১ এর ভিতরে সাতটি রানওয়ে আছে। ছবিতে আরো দেখা যায় বড় বড় গুদাম ঘর, আবাসিক এলাকা,ফায়ার স্টেশন,বিশাল আকারের পানির ট্যাংকি, বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রন টাওয়ার, খেলাধুলা করার জন্য টেনিস এবং বেসবল কোর্ট। আরো আছে যোগাযোগের জন্য বেশ কয়েকটি স্যাটেলাইট ডিশ।

image052

ছবিগুলা দেখে যে ধারণা করা হয়েছে যে, সেখানকার কর্মীদের জন্য প্রায় সব ধরনের আবাসিক সুজক সুবিধা দেয়া হয়েছে। তবে বাহিনীর লোকজন তথা এরিয়া ৫১ প্রজেক্টে যারা কাজ করে তাদের অবাধ বিচরণের কিন্তু কোন সুজক নেই। এমনকি কারা সেখানে কাজ করছে তাদের পরিচয় কি সেটিও বাইরের কোন মানুষ বলতে পারবে না। কর্তিপক্ষের ওপরে সবসময় একটি চাপ কাজ করতো যে, হয়তো এটি যদি শত্রু পক্ষ জানতে পারে তবে যেকোনো ভাবে চেষ্টা করবো তাদের কাছ থেকে ভেতরের তথ্য বের করার।

এরিয়া ৫১ এর নিরাপত্তা ব্যাবস্থা অনেক শক্তিশালী। এরিয়া ৫১ এ ঢোকার জন্য কোন পিচের রাস্তা নেই। শুধু একটি মাটির রাস্তা আছে যা নেভেদার হাইওয়ে ৩৭৫ সিস্টেমের সাথে সংযোগ করা। এই রাস্তাটি প্রায় ৩৫ মাইল লম্বা, এর মধ্যে পশ্চিম এবং উওর পশ্চিম দিকের ১০ মাইল পড়ে এই রাস্তার এক মাথা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এরিয়া ৫১ এর মূল গেট ঘাটি থেকে প্রায় ২৫ মাইল দূরে অবস্থিত।

এত সুরক্ষিত স্থান, নিরাপত্তাও সর্বাধুনিক। এর এলাকার চারিপাশে না আছে কোন দেয়াল বা কোন বেড়া। শুধু আছে কয়েকটি সাইনবোর্ড। কিন্তু সবার অলক্ষ্যে কাজ করে অনেক প্রযুক্তি। যেমনঃ Mobile CC Camera, Motion detector (নড়াচড়া পর্যবেক্ষক), Laser detector (লেজার পর্যবেক্ষক), Sound detector (শব্দ পর্যবেক্ষক) আর সব থেকে আধুনিক Smell detector (ঘ্রান পর্যবেক্ষক) আর এছাড়া আকাশ পথ দেখার জন্য রয়েছে রাডার। এই ঘ্রান পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে আসে পাশে থাকা যে কোন মানুষ বা বন্য প্রানীর অস্তিত্ব তারা পর্যবেক্ষন করতে পারে।

এখানে অনেক উপরের নীতি নির্ধারকদের অনুমতি বাদে প্রবেশ সম্পুর্ন নিষেধ আর ঢুকলেই তার মৃত্যু অনেকটাই অবধারিত। কেননা ক’দিন আগেও যে স্থানের কোন অস্তিত্ব ছিল না কাগজ কলমে সেখানে সাধারন আইন কানুন মানা হয় না। তাই আপনার কোন বিচার হবে না কোন আদালতে। মাঠেই আপনার বিচার, মাঠেই আপনার শাস্তি। মানবাধিকার এখানে কোন মূল্য রাখে না। এবার ধরুন আপনি কোন মতে এই সব সুরক্ষা ব্যাবস্থাকে কাটিয়ে ভিতরে ঢুকলেন। এবার আরো বড় সমস্যা। মনে রাখবেন এটি মরুভূমির মধ্যে অবস্থিত। আর আপনাকে পারি দিতে হবে প্রচন্ড গরমে শুকিয়ে যাওয়া গ্রুম লেক। এখানে যদি আপনি অবস্থান করতে যান তাহলে দিনে আপনাকে ৪ গ্যালন পানি পান করতে হবে। তা না হলে আপনি ৪ দিনের বেশী টিকে থাকতে পারবেন না। আর রাতের বেলা সম্মুক্ষিন হবেন শীতের। অর্থাৎ এত কিছু নিয়ে কোন ভাবেই আপনি সুরক্ষা দেওয়ার ভেদ করতে পারবেন না। আর ধরুন আপনি একটা গাড়ি নিয়ে কোন এক ভাগ্যের জোরে পার করলেন সব সুরক্ষা ব্যাবস্থা। এখন আপনাকে পারি দিতে হবে এই গ্রুম লেক। গাড়ি চালাচ্ছেন মনের সুখে। ভাবছেন একটানে চলে যাবেন এরিয়া ৫১ এর প্রানকেন্দ্রে। কিন্তু আপনি যাচ্ছেন শুকিয়ে যাওয়া এক লেকের উপর দিয়ে। আপনার পিছে উড়ছে বালি। আর অনেক দূর থেকেই বোঝা যাবে আপনার অবস্থান। এখন বুঝলেন প্রাকৃতিক ভাবেও এই এরিয়া ৫১ কেমন সুরক্ষিত।

PD44915296_gl_new0_1923513b

 

Comments

comments