কিংবদন্তির প্রেমকাহিনী

আমাদের দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে অনেক পুরনো প্রেমকাহিনী। কিংবদন্তিতে পরিণত হওয়া এমন কয়েকটি কাহিনী পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল।

অনিরুদ্ধ-ঊষাবতী

সে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের কথা। তখন বাংলায় পাল রাজত্ব কেবল শুরু হয়েছে। দিনাজপুরের রাজা ছিলেন বাণরাজ। বাণরাজার এক মেয়ে। নাম তার ঊষাবতী। অপরূপ রূপসী।

প্রতিদিনের মতো সেই সন্ধ্যায়ও ঊষাবতী নদীর ঘাটে গোসল করছিল। যুবরাজ অনিরুদ্ধের নৌকা তখনই নদীর ঘাট পেরুচ্ছিল। ঊষাবতীকে দেখে যুবরাজ একেবারে হতভম্ব হয়ে গেল। কোনো মানবী এত সুন্দরী হতে পারে! নৌকা ঘাটে ভেড়াতে বলল। ততক্ষণে ঊষাবতীর গোসল শেষ। পারে উঠে হঠাৎ দেখে, একটি নৌকা ভিড়েছে। আর তাতে বসে আছে এক দেবতুল্য পুরুষ।

প্রথম দেখায়ই দুজনে দুজনার প্রেমে পড়ে গেল। কিন্তু ঊষাবতীর শিবভক্ত বাবা ও অনিরুদ্ধ পরস্পরকে পছন্দ করেন না মোটেই। তার পরও অনিরুদ্ধ স্বর্ণপত্রে লিখে বিয়ের পয়গাম পাঠালেন। বাণরাজা তা প্রত্যাখ্যান করলেন। উপায় রইল একটাই—যুদ্ধ।

সে যুদ্ধে সায় দিল ঊষাবতীও। কিন্তু বাণরাজের সৈন্য বাহিনীও বিশাল। কাজেই পরপর দুইবার যুদ্ধে হারলেন তিনি।

কিন্তু ঊষাবতীকে ছাড়া বেঁচে থাকারও তো মানে হয় না। কাজেই মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টায় নামল যুবরাজ। এবার রাজা চন্দ্রগুপ্তের সাহায্য প্রার্থনা করল। তাঁর সেনাপতি গোয়াসিন যুদ্ধজয়ের দায়িত্ব তুলে নিলেন কাঁধে।

কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে এসে তো গোয়াসিন তাজ্জব। বাণরাজার এত সৈন্য! কাজেই বুদ্ধি খাটালেন। সে অনুযায়ী বানানো হলো একটি বৃষমূর্তি। তারপর সেই ষাঁড়ের মূর্তিটাকে ভাসিয়ে দেওয়া হলো ময়দানের জলাশয়ে। যে জলাশয়ে মৃত ষাঁড় ভাসছে, সেখানকার পানি তো খাওয়া যাবে না। কাজেই বাণরাজার সৈন্যরা পিছু হটতে শুরু করল। আর তখনই পুরো সৈন্যদল নিয়ে আচমকা আক্রমণ চালালেন গোয়াসিন। বাণরাজার বিশাল সৈন্য বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। যুদ্ধে জিতে যুবরাজ অনিরুদ্ধ তুলে নিয়ে এলো রাজকন্যা ঊষাবতীকে। ধুমধাম করে তাদের বিয়েও হলো।

বাকের-খনি

তখন মুর্শিদাবাদের নবাব ছিলেন মুর্শিদ কুলি খাঁ। তাঁর পালিত ছেলে আগা বাকের খাঁ। বাকের খাঁকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন মুর্শিদ কুলি খাঁ। তাঁর উজির ছিলেন জাঁহানদার খাঁ। তাঁর ছেলের নাম জয়নুল। এই আগা বাকের খাঁ আর জয়নুলের চরিত্র ছিল একদম বিপরীত। আগা বাকের খাঁ ছিলেন খাঁটি সজ্জন ব্যক্তি। মুর্শিদাবাদের মানুষও তাঁকে ভীষণ ভালোবাসত। ওদিকে নায়েব দয়াল দাসের সঙ্গে ঘোঁট পাকিয়ে নারীদের সতীত্ব নাশ করা ছিল জয়নুলের নেশা। বন্ধু ছিল বর্গি দস্যু সর্দার চায়েসতু আর আরাকান-মগ দস্যু সর্দার ওলাংপু।

নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁর রংমহলের নাম ছিল আরামবাগ। এই আরামবাগের সেরা নর্তকী ছিল খনি বেগম। রূপে-গুণে অতুলনীয়। এই খনি বেগমের সঙ্গে প্রেম হয়ে যায় আগা বাকের খাঁর। একদিন রংমহলে গেছেন নবাব। নর্তকীরা এসে নাচ-গান শুরু করল। কিন্তু নবাব খেয়াল করলেন, নেই সেরা নর্তকী খনি বেগম। তাঁর হাঁকডাক শুনে জাঁহানদার খাঁ এসে জানালেন, বাকের খাঁ-খনি বেগমের প্রেমের কথা। সে রাতেই নাকি তাঁরা দুজনে পালিয়ে যাচ্ছিলেন মুর্শিদাবাদ ছেড়ে। পথরোধ করে জয়নুল। তখন বাকের খাঁ এক কোপে জয়নুলের মাথা ধড় থেকে আলাদা করে দেন। তবে ধরা পড়েন বাকের-খনি। তাঁদের আটকে রাখা হয় কারাগারে।

খনি বেগমের সঙ্গে বাকেরের প্রেমের বিষয়ে নবাব তেমন রাগ করেননি। প্রেম যে হৃদয়ের ব্যাপার, তা যে নিয়মকানুন মানে না, সেটা জানেন তিনি। কিন্তু বাকের খাঁ তো রীতিমতো খুনি। অবশ্য বাকের খাঁ দাবি করলেন জয়নুল নাকি খনি বেগমের সতীত্ব নাশ করতে এসেছিল। পরে বাকের খাঁর সঙ্গে যুদ্ধে না পেরে পালিয়ে গেছে। নবাব অবশ্য জাঁহানদার খাঁর কথাই বিশ্বাস করলেন। বিচারে রায় হলো, বাকের খাঁকে বাঘের খাঁচায় নিক্ষেপ করা হবে।

পরদিন সকালে বাকের খাঁকে বাঘের খাঁচায় নিক্ষেপ করা হলো। কিন্তু বাকের খাঁ খালি হাতেই হারিয়ে দিলেন বাঘকে। কিন্তু তারপর রংমহলে গিয়ে দেখা গেল, খনি বেগম কোথাও নেই। খোঁজ নিতে জানা গেল খনি বেগমকে নিয়ে পালিয়ে গেছে জয়নুল। এবার সব কথা পরিষ্কার বোঝা গেল। পুত্রের কুকীর্তির কথা জানতে পারলেন জাঁহানদার খাঁও। সঙ্গে সঙ্গে জাঁহানদার খাঁ আর আগা বাকের খাঁ ছুটলেন জয়নুলের বন্ধু দস্যুদের আস্তানায়। দক্ষিণের জঙ্গলের পানে।

ভীষণ যুদ্ধে দস্যুদের পরাজিত করে তাড়িয়ে দেওয়া হলো। তারপর খুঁজে বের করা হলো সেই ঘর, যেখানে খনি বেগমকে নিয়ে লুকিয়ে আছে জয়নুল। জাঁহানদার খাঁ যখন ওখানে পৌঁছলেন, সেখানে তখন এক ভয়ংকর পরিস্থিতি। জ্যান্ত সাপ নিয়ে খনি বেগমকে ভয় দেখাচ্ছে জয়নুল। যেই সেখানে উপস্থিত হলেন জাঁহানদার খাঁ, হকচকিয়ে জয়নুল তাড়াহুড়া করে ঘুরতে গেল আর সাপটা তাকেই কামড়ে দিল। কিন্তু মরার আগে ছোরা বের করে খনি বেগমের গায়ে বসিয়ে দিল সে। যাকে সে পেল না, তাকে কাউকে পেতে দেবে না। ততক্ষণে চলে এসেছেন আগা বাকের খাঁও। কিন্তু আর তো কিছু করার নেই। মারা গেল খনি বেগম।

নিজ হাতে পুত্রের শাস্তি নিশ্চিত করে আত্মহত্যা করলেন জাঁহানদার খাঁ। আর প্রিয়তমার শোকে পাগলের মতো হয়ে গেলেন বাকের খাঁ। আর ফিরে গেলেন না মুর্শিদাবাদে। শেষে তার আশা ছেড়ে দিয়ে দক্ষিণের অঞ্চলটাই বাকের খাঁকে ছেড়ে দিয়ে চলে এলেন মুর্শিদ কুলি খাঁ। বাকের-খনির স্মৃতিবিজড়িত ওই অঞ্চলটাই পরে পরিচিত হয় বাকেরগঞ্জ নামে। এই বাকেরগঞ্জই এখন পরিচিত বরিশাল নামে।

গাজী-সুভদ্রা

১৬ শতকে ভাটি অঞ্চলের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ রাজা ছিলেন মুকুট রায়। তাঁর রাজধানী ছিল কপোতাক্ষ নদের তীরে। এত বড় রাজ্য একা চালাতে পারতেন না বলে উত্তর অংশের ভার নিজের হাতে রেখে দক্ষিণ অংশের শাসনভার দিয়েছিলেন সেনাপতি দক্ষিণ রায়ের হাতে। মুকুট রায় যেমন দুর্ধর্ষ রাজা ছিলেন, দক্ষিণ রায় ছিলেন তেমনি দুর্ধর্ষ সেনাপতি।

এই মুকুট রায়ের মেয়ের নাম সুভদ্রা। সুভদ্রা একদিন ভোরবেলা বাগানে বেড়াচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখেন কী, এক লোক নতজানু হয়ে উপাসনা করছেন। কী সুন্দর তাঁর চেহারা! উপাসনা শেষ করে সেই লোক সুভদ্রার দিকে তাকালেন। প্রথম দেখায় তিনিও সুভদ্রার প্রেমে পড়ে গেলেন। কিন্তু সুভদ্রা ব্রাহ্মণ রাজা মুকুট রায়ের মেয়ে। তিনি মুসলমান তো দূরে থাক, অন্তজ হিন্দুদেরও দেখতে পারেন না। ওদিকে উপাসনারত সেই লোকটির নাম গাজী। বিখ্যাত কামেল ফকির। অলৌকিক ক্ষমতার বলে সুন্দরবনের সব বাঘ তাঁর বশে ছিল।

কাজেই তাঁকে জামাই হিসেবে মুকুট রায় মেনে নেবেন না, সেটাই স্বাভাবিক। অতএব গাজী মুকুট রায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। সে এক ভয়ংকর যুদ্ধ। ভাটি অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজা মুকুট রায়। তাঁর ওপর তাঁর সেনাপতি দক্ষিণ রায়েরও অলৌকিক ক্ষমতা ছিল। সুন্দরবনের সব কুমির তাঁর কথা শুনত। ওদিকে গাজীর সঙ্গে যোগ দিলেন সোনারপুরের সুলতান হুসেন শাহ। গাজীর বিশাল বাহিনী দেখে দক্ষিণ রায় আক্রমণ করলেন অতর্কিতে। প্রথম যুদ্ধে গাজীর পরাজয় ঘটল।

হুসেন শাহ আরো সৈন্য দিলেন গাজীকে। কিন্তু দক্ষিণ রায়ের যতই সৈন্য মরুক, কমে না একজনও। চিন্তিতই হয়ে পড়েছিলেন গাজী। তারপরই তাকিয়ে দেখেন, সৈন্যের ছদ্মবেশে স্বয়ং সুভদ্রা এসেছেন। জানালেন, মুকুট রায়ের প্রাসাদের পাশেই এক কুপ আছে। তার জল ছিটিয়ে দিলেই মৃত মানুষ জীবিত হয়ে যায়। তার বলেই দক্ষিণ রায় অজেয়। সে কুপের জাদুকরী ক্ষমতা নষ্ট করার একটাই পথ—কুপে এক টুকরো গোমাংস ফেলে দিতে হবে।

চটজলদি গাজী তাঁর বিশ্বস্ত এক সৈন্য এক টুকরো গরুর মাংস নিয়ে কুপে ফেলে দিয়ে এলো। তারপর দক্ষিণ রায়কে হারাতে আর বেশি সময় লাগল না। আয়োজন করে গাজী-সুভদ্রার বিয়ে হলো। গাজী মারা গেলে সুভদ্রা স্বামীর মতো আধ্যাত্মিকতার প্রতি ঝুঁকে পড়েন। বাস করতেন সাতক্ষীরা শহরের ধারের লাবসা গ্রামে। গলায় সব সময় চাঁপা ফুলের মালা পড়ে থাকায় তাঁর নাম হয়ে যায় ‘চম্পামাঈ’ বা ‘মাঈ চম্পা’। মারা যাওয়ার পর স্থানীয় লোকজন তাঁর কবরের চারপাশে চাঁপা ফুলের গাছ লাগিয়ে দেয়। তাঁর সেই দরগাটাই পরিচিত ‘মাঈ চম্পার দরগা’ নামে।

সূত্র : বাংলাদেশের কিংবদন্তী

শামসুল ইসলাম

 

Comments

comments