ইয়াজুজ-মাজুজ কারা এবং কখন আবির্ভাব হবে- পর্ব ১

ইয়াজুজ মাজুজ জাতি সম্পর্কে আমরা কমবেশি সবাই জানি। এ জাতির কথা পবিত্র কুরআন শরীফ ও বাইবেলে লিখা রয়েছে। এজাতি অত্যাচারিত ও রাক্ষুসে জাতি বলেও কোথাও কোথাও বর্ননা করা হয়েছে। খৃষ্টান ধর্মেও ইয়াজুজ মাজুজ জাতিকে গগ আর ম্যাগগ হিসেবে বর্ননা করা হযেছে। অন্যান্য ধর্মেও এদের কথা ভিন্ন ভিন্ন নামে রয়েছে।

ইসলামে আলোকে ইয়াজুজ-মাজুজ আদম (আঃ) এর বিতাড়িত সন্তানের মাধ্যমে সৃষ্ট দুই অভিশপ্ত জাতি বলে বর্ননা করা হয়েছে।

জুলকারনাইন (আঃ) আল্লাহর আদেশে এদের আটকিয়ে প্রাচীর দ্বারা আলাদা করে দিয়েছেন।

বহু বছর পর দাজ্জালের ধংশের পর এরা প্রাচীর ভেঙ্গে আবার বেরিয়ে এসে অত্যাচার শুরু করবে।

কোথাও কোথাও এদেরকে রাক্ষুসে জাতি হিসেবে বর্ননা করা হয়েছে।

কেউ কেউ জুলকারনাইন (আঃ) আর আলেকজান্ডার একই ব্যাক্তি বলে উল্লেখ করেছেন।

আসলে তারা কারা…?

ইয়াজুজ-মাজুজ কি দুইজন মানুষ না দুই জাতি?

এদের অবস্থান কোথায় ?

তাদের চালচলনই বা কেমন?

তাদের সংখ্যা কত?

কবে তারা মুক্ত হবে?

তাদের আকার-আকৃতি কেমন?

অভিশপ্ত ইয়াজুজ-মাজুজ সম্প্রদায় কাদের বংশধর এনিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন তারা আদম (আঃ) এর বংশধর। আবার কেউ কেউ মনে করেন তারা হযরত নূহ (আ:) এর পুত্র ইয়াকেলের বংশধর।

তারা কেয়ামতের প্রাক্কালে ঈসা (আঃ) এর সময় পৃথিবীতে উত্থিত হবে। চলুন জেনে নেয়া যাক তারা কাদের বংশধর।

ইয়াজুজ-মাজুজ তুরস্কের বংশোদ্ভুত দুটি জাতি। কুরআন মাজীদে এ জাতির বিস্তারিত পরিচয় দেয়া হয়নি। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে তাদের নাক চ্যাপ্টা, ছোট ছোট চোখ বিশিষ্ট। এশিয়ার উত্তর পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এ জাতির লোকেরা প্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন দেশের উপর হামলা করে লুটতরাজ চালাত। মাঝে মাঝে এরা ইউরোপ ও এশিয়া উভয় দিকে সয়লাবের আকারে ধবংসের থাবা বিস্তার করতো।

বাইবেলের আদি পুস্তকে তাদেরকে হযরত নূহ (আ:) এর পুত্র ইয়াকেলের বংশধর বলা হয়েছে। মুসলিম ঐতিহাসিকগণ ও একথাই মনে করেন রাশিয়া ও উত্তর চীনে এদের অবস্থান বলে বর্ণনা পাওয়া যায়।

সেখানে অনুরূপ চরিত্রের কিছু উপজাতি রয়েছে যারা তাতারী, মঙ্গল, হুন ও সেথিন নামে পরিচিত। ইসরাঈলী ঐতিহাসিক ইউসীফুল তাদেরকে সেথীন জাতি মনে করেন।

অাবার হাদীস ও বিভিন্ন ইসলামিক গ্রন্থের বর্ননা অনুযায়ী ইয়াজুজ এবং মাজুজ হচ্ছে আদম সন্তানের মধ্যে দু-টি গোত্র। তাদের মধ্যে কিছু মানুষ অস্বাভাবিক বেঁটে, আবার কিছু অস্বাভাবিক লম্বা।

কিছু অনির্ভরযোগ্য কথাও প্রসিদ্ধ যে তাদের মাঝে বৃহৎ কর্ণবিশিষ্ট মানুষও আছে, এক কান মাটিতে বিছিয়ে এবং অপর কান গায়ে জড়িয়ে বিশ্রাম করে। বাদশা যুলকারনাইনের যুগে তারা অত্যধিক বিশৃঙ্খল জাতি হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল।

পূর্বেই বলা হয়েছে যে, তারা হচ্ছে আদম সন্তানেরই এক সম্প্রদায়। হাফেয ইবনে হাজার (রহ:) এর মতে- তারা নূহ (আ:) এর পুত্র ইয়াফিছের পরবর্তী বংশধর।

 

কুরআনে জুলকারনাইন সম্পর্কিত বর্ণনা

কুরআন শরীফের সূরা কাহাফের আয়াত নম্বর ৮৩-১০১ অংশে জুলকারনাইন সম্পর্কিত বর্ণনা আছে। নবী হিসেবে জুলকারনাইনের নাম উল্লেখ নেই যদিও কিন্তু তিনি নবী ছিলেন না এমনটিও বলা হয়নি। বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তাঁকে সকল বিষয়ে পথনির্দেশ বা দিকনির্দেশ এবং/অথবা কার্যপোকরণ দিয়েছেন। তিনি এরপর দুটি পথ অনুসরণ করেন। এর মধ্যে এক পথে গিয়ে তিনি ইয়াজুজ মাজুজের হাতে অত্যাচারিত এক জাতির দেখা পান। তিনি তাদের জন্য গলিত তামার তৈরি একটি প্রাচীর বানিয়ে দেন। সূরা কাহাফ ৮৩-৮৬ নম্বর আয়াতে নিম্নরূপ বর্ণিত আছেঃ

“তারা আপনাকে যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুনঃ আমি তোমাদের কাছে তাঁর কিছু অবস্থা বর্ণনা করব।

আমি তাকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ের কার্যোপকরণ দান করেছিলাম। অতঃপর তিনি এক কার্যোপকরণ অবলম্বন করলেন।অবশেষে তিনি যখন সুর্যের অস্তাচলে পৌছলেন; তখন তিনি সুর্যকে এক পঙ্কিল জলাশয়ে অস্ত যেতে দেখলেন এবং তিনি সেখানে এক সম্প্রদায়কে দেখতে পেলেন। আমি বললাম, হে যুলকারনাইন! আপনি তাদেরকে শাস্তি দিতে পারেন অথবা তাদেরকে সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পারেন।”

জুলকারনইন পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে বেড়াতেন নির্যাতীত, বঞ্চিত, শাসকের হাতে শোসিত লোকদের মুক্তি দিতেন। কুরআনের বর্ননা অনুযায়ী অরুণাচলে, যেখান থেকে সূর্য উদিত হয় সেখানে ইয়াজুজ, মাজুজের হাত থেকে জনগণকে রক্ষা করার জন্য দেয়াল তুলে দিয়েছিলেন জুলকারণাইন। আর সে স্থানটি পাহাড়ের প্রাচীরের মাঝখানে। সূরা কাহাফের ৯৩ হতে ৯৮ নম্বর আয়াতে জুলকারনাইনের এই প্রাচীর নির্মাণের উল্লেখ আছে।  ধারণা করা হয় এই জাতি ধাতুর ব্যবহার জানতো। তারা হাপর বা ফুঁক নল দ্বারা বায়ু প্রবাহ চালনা করে ধাতুকে উত্তপ্ত করে গলাতে পারতো এবং তারা লোহার পিন্ড ও গলিত সীসাও তৈরি করতে পারতো। পরবর্তী আয়াতের বিভিন্ন বাংলা অনুবাদে গলিত তামার উল্লেখ আছে; ইংরেজি অনুবাদে তামার স্থলে সীসার উল্লেখ আছে। জুলকারনাইন তাদের প্রতিরোধ প্রাচীর তৈরি করার জন্য উপাদান ও শ্রম সরবরাহ করতে বললেন। তারা নিজেরাই জুলকারনাইনের আদেশ মত দুই পর্বতের মাঝে শক্ত লোহার প্রাচীর বা দ্বার তৈরি করলো।

 

জুলকারনাইনের প্রাচীর

এই প্রাচীরটির সঠিক অবস্থান নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। এ সম্পর্কে নানা মতবাদ প্রচলিত। একটি মতবাদ অনুসারে, কুরআনের বর্ননা অনুযায়ী অরুণাচলে, যেখান থেকে সূর্য উদিত হয় সেখানে ইয়াজুজ, মাজুজের হাত থেকে জনগণকে রক্ষা করার জন্য দেয়াল তুলে দিয়েছিলেন জুলকারনাইন। আর সে স্থানটি পাহাড়ের প্রাচীরের মাঝখানে। এই বর্ণনার সাথে মিলে যায় এমন একটি দেয়াল রয়েছে কাসপিয়ান সাগর উপকূলে। ইতিহাসবিদদের দ্বারা স্বীকৃত যে এ দেয়াল তৈরি করেছিলেন আলেকজান্ডার। যা তৈরি করতে লোহা ও তামা ব্যবহৃত হয়েছে। সেখানে একটি তোরণ রয়েছে যেটি ‘কাসপিয়ান গেট’ বা আলেকজান্ডারের গেট নামে পরিচিত। দারিয়াল এবং দারবেন্ত নামে দুটি শহরে এর ব্যপ্তি। দারিয়াল রাশিয়া এবং জর্জিয়ার সীমান্তে অবস্থিত। এটিকে বলা হয় কাজবেক পাহাড়ের পূর্ব প্রান্ত। দারবেন্ত রাশিয়ার দক্ষিণে অবস্থিত একটি শহর। কাসপিয়ান সাগরের দক্ষিণপূর্ব উপকূলে নির্মীত এ দেয়ালটি তোলা হয়েছে দুটি পাহাড়ের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানে। এ পাহাড় দুটিকে বলা হয় পৃথিবীর উঠান আলেকজান্ডার নির্মীত এ দেয়ালের উচ্চতা ২০ মিটার এবং এটি ৩ মিটার (১০ ফুট) পুরু।

 

আরও পড়ুন

ইয়াজুজ-মাজুজ কারা এবং কখন আবির্ভাব হবে- পর্ব ২

 

 

Comments

comments